আনকথা #১৩

"নিরুদ্দেশ সম্পর্কিত ঘোষণা" হতো আকাশবাণী-দূরদর্শনে - সেই যখন আমাদের দিনগুলো ছিলো সহজ সাদাকালো। খবরের কাগজেও বিজ্ঞাপন বেরোতো, নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া মানুষটির কথা দিয়ে। আমি বেশ মন দিয়ে পড়তাম, দেখতামও। ভাবতাম কী হয় এই মানুষগুলোর সঙ্গে! কতজন আবার ফেরে? না ফেরার দলেই বা থেকে যায় কতজন? ফেরে না যারা তারা কি ইচ্ছে করেই হারায় নাকি জীবনস্রোত অন্য দিকে নিয়ে যায় তাদের? একটা ভয় মিশ্রিত কষ্টের অনুভূতি হতো, যেটাকে সেই অপরিণতবুদ্ধির আমি ঠিক বুঝতে পারতাম না, তাই আবার উড়িয়েও দিতাম। 
এখন ভাবি খোঁজ পেলে যেখানে জানানোর কথা বলা থাকে, ধরে নেওয়া যায় সেটা নিখোঁজ মানুষটার বাড়ি। কিছু ইঁট-কাঠ-পাথরে বানানো আর সংখ্যা-অক্ষরে নির্দেশিত একটা জায়গা "ঠিকানা" থেকে "বাড়ি" হয়ে ওঠে যে জিয়নকাঠির স্পর্শে, নিজে থেকে নিখোঁজ মানুষেরা কি তা হারিয়ে ফেলে? এক লহমায় সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার ব্যথা তাদের নিয়ে ফেলে নিরুদ্দেশের দেশে? তাদের ফিরে পেতে চেয়ে যে প্রিয়জনেরা বিজ্ঞাপন দেন, অপেক্ষা করেন তারা নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে মানুষটিকে বুঝতে দেননি কি যে তারা তাকে কতটা ভালোবাসেন? বুঝলে হয়তো তিনি নিখোঁজ হতেন না.. 

এবড়োখেবড়ো ভাবনা আমার, সম্বিত ফিরলে দেখি অহর্ণিশ কত কিছুই নিঁখোজ হচ্ছে জীবন থেকে। প্রিয় ডাকগুলো, আশীর্বাদের হাতগুলো, আলো ঝিলমিল শিশিরদানার মতো উজ্জ্বল বিস্ময়গুলো.... হারাচ্ছি প্রতিদিন। মুঠো থেকে খসে পড়ছে সময়, কত কিছু করা হলো না। মনের প্রতিটা কোণকে রঙিন করে দোল খেললাম না কখনও, নিজের মনের মতো করে একটা সুন্দর ছবির মতো ঘরও আঁকলাম না, গলা ছেড়ে ভালোবাসার গান গাওয়া হলো না। 

উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি উড়ে করুণ করে ঠাঁই পেলে তার জীবন ধন্য হয়..যে অনাদরের ধুলোবালি খড়কুটো এসেছিলো সেই একই পথে, কিছু কি ছিলো তার সাথে ভালোবাসার ধন, দেখা হয়নি..হারিয়েছে মন, দৃষ্টি..বসন্ত বিগত।

তবু বিকালের রোদ চলে যেতে যেতে কিছু রঙ রেখে গেলে অকারণে সুখ ভাবতে ভালো লাগে। 

Comments

Popular posts from this blog

আনকথা #১২

অলিখিত #৪

অলিখিত #৩